0

তিতা বা তিক্ত খাবার মোটামোটি আমরা অনেকেই এড়িয়ে চলি। খেতে সুস্বাদু হয় না বলে বাদ দিয়ে দেই আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা থেকে। কিন্তু আমাদের দেহে ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণের জন্য যেমন মিষ্টি প্রয়োজন, তেমন তিক্ত খাবারেরও প্রয়োজন রয়েছে। এই তিতা খাবার আমাদের দেহের ভেতর থাকা বিষাক্ত পদার্থ পরিষ্কার করে দেহকে সুস্থ্য রাখে এবং পাশাপাশি বিপাকীয় কার্যক্রম বাড়ায়। এছাড়াও নানা রোগের উপশম হিসেবে কাজ করে তিতা জাতীয় খাবার। আর এই সকল খাবারের মধ্যে অন্যতম হল চিরতা।

চিরকালের তিতা গাছ বলেই হয়তো এর নাম দেয়া হয়েছে চিরতা। খেতে তিতা হলেও এর গুণাগুণ মিঠা খাবারের থেকে বেশি। নানান রোগ নিরাময়ে এই চিরতার ব্যবহার বিশ্ব জুড়ে প্রচলিত রয়েছে। চর্ম রোগ থেকে শুরু করে হেপাটাইটিস, ডায়াবেটিস, ম্যালেরিয়া জ্বর, অ্যাজমা প্রভৃতি কঠিন অসুখের চিকিৎসাতেও চিরতা ব্যবহার করা হয়। এর উপকারিতা সম্পর্কে বিষদ ধারণা থাকলে সকলেই নিয়মিত চিরতা খেত। তাই স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে চলুন জেনে নেয়া যাক চিরতার উল্লেখযোগ্য কিছু ভেষজ গুণ ও ব্যবহার সম্পর্কে।

চিরতার উপাদান

চিরতায় বিদ্যমান সবচেয়ে তিক্ত উপাদানটি হলো অ্যামারোজেন্টি নামক গ্লুকোসাইড। আরও দুটি তিক্ত স্বাদযুক্ত গ্লুকোসাইড হল অফেলিক এসিড ও চিরাটিন। এছাড়াও চিরতায় নানা প্রকার অ্যালকালয়েড ও ট্রাইতারপিনয়েড বিদ্যমান। বিভিন্ন জ্যান্থোনস, স্টেরল, লিগন্যান প্রভৃতি উপাদান চিরতার ভেষজ গুণাবলি ও উপকারীতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

চিরতার উপকারিতা

১। হজম ক্ষমতা বাড়ায়

পাকস্থলির সুস্থতায় চিরতা দারুণ কার্যকর। এর তেতো স্বাদ বদহজম, গ্যাস, আলসার ইত্যাদি সমস্যা দূর করে বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখে। ফলে দেহের হজম শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং পাকস্থলির সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে।

২। হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়

চিরতার মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী এন্টি অক্সিডেন্ট। যা বার্ধক্যকে বিলম্বিত করতে পারে। গবেষণায় প্রমাণিত যে, নিয়মিত চিরতা সেবনে ক্যানসার ও হৃদরোগে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়। তাই ডাক্তাররাও রোগীদেরকে চিরতা খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

৩। জ্বর ভাল করে

বাংলাদেশে কয়েক মাস পর পর ঋতু পরিবর্তন হয়। সেই সাথে অনেকের সর্দি-কাশি সহ জ্বর দেখা দেয়। তখন হাতে-পায়ে ব্যথা সহ শরীর দূর্বল লাগে এবং একধরণের অস্বস্তি অনুভব হয়। এরকম অবস্থা হলে ৫-১০ গ্রাম চিরতা ৪ কাপ পানিতে সিদ্ধ করে ২ কাপ থাকতে নামিয়ে ঠাণ্ডা করতে হবে। পরে তা ছেঁকে সকালে অর্ধেক ও বিকালে অর্ধেক খেতে হবে। এভাবে কয়েকদিন চিরতা খেলে আপনার জ্বর ভাল হয়ে দূর্বলতার ভাব কেটে যাবে।

৪। এলার্জি দূর করে

যাদের এলার্জি হয়ে শরীর চুলকায় এবং ত্বক ফুলে লাল হয়ে যায়, তারা চিরতার শরণাপন্ন হয়ে এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে পারেন। এলার্জি সারাতে চিরতার রস অত্যন্ত উপকারী। আগের দিন রাতে শুকনো চিরতা গুড়া ৪-৫ গ্রাম পরিমাণ এক গ্লাস (২৫০ মিলিলিটার) গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। পরদিন ওটা ছেঁকে দিনের মধ্যে ২-৩ বারে খেতে হবে। এতে আপনার চুলকানি জাতীয় সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে। পাশাপাশি যেসব খাবার খেলে এলার্জি হয়, সেসব খাবার না খাওয়ার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে পুঁইশাক, বেগুন, চিংড়ি মাছ, ইলিশ মাছ, হাঁসের ডিম ইত্যাদি খাওয়া মোটেও উচিত হবে না।

৫। ভাইরাস সংক্রমণ রোধ করে

চিরতার তেতো স্বাদ আমাদের দেহকে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া থেকে রক্ষা করে। ফলে শরীরে রোগ-বালাই কম হয় এবং সুস্থ থাকে।

৬। রক্তশূণ্যতা পূরণ করে

চিরতা দেহে রক্তকোষ গঠনের মাধ্যমে রক্তশূন্যতা কমায়। ঋতুস্রাব বা মাসিকে অনেকের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। তাদের জন্য চিরতার রস অনেক উপকারী। এমনকি কোথাও কেটে গেলে সে কাটা স্থানে চিরতার রস লাগিয়ে দিলে দ্রুত রক্ত পড়া বন্ধ হয়। অভ্যন্তরীন রক্তক্ষরণ, নাক দিয়ে রক্তপড়া এসব বন্ধ করতেও চিরতা অত্যন্ত কার্যকর

৭। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে

নিয়মিত চিরতা খেলে রক্তে থাকা চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটি দেহে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করে। এক্ষেত্রে আগের দিন রাতে শুকনো চিরতা গুড়া ৪-৫ গ্রাম পরিমাণ এক গ্লাস (২৫০ মিলিলিটার) পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। পরদিন ওটা ছেঁকে সকালে খালি পেটে খেতে হবে। খেতে তিতা লাগলেও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী।

৮। কৃমি সারায়

চিরতার এই উপকারীতা সম্পর্কে মোটামোটি সবাই অবগত। কৃমি সারাতে চিরতার কোন বিকল্প নেই। পেটে কৃমি হলে পেটের উপরের অংশটা মোচড়ায়, ব্যথা করে এবং অস্বস্তি অনুভব হয়। এই সমস্যা থেকে পরিত্রান পেতে আধা গ্রাম চিরতার গুঁড়ো সকালে মধুসহ বা চিনি মিশিয়ে চেটে খাবেন। এতে দ্রুত কৃমির উপদ্রব চলে যাবে।

৯। চুল পড়া কমায়

যাদের ঘন ঘন চুল পড়ে তারা চিরতা ব্যবহার করে দেখতে পারেন। এর ভেষজ গুণাগুণ মাথা থেকে চুল পড়া কমায় এবং চুল সিল্কি ও মজবুত করে। এক্ষেত্রে আগের দিন রাতে এক কাপ গরম পানিতে ৫ গ্রাম চিরতা ভিজিয়ে রেখে পরদিন সেই পানি ছেঁকে তা দিয়ে মাথা ধুয়ে ফেলতে হবে। একদিন পর পর একদিন এভাবে চিরতার পানি দিয়ে মাথা ধুতে হবে। ৩-৪ বার এভাবে ধুতে পারলে চুল অনেকাংশে কমে যাবে।

১০। হাঁপানি দূর করে

যাদের এজমা বা হাঁপানি জাতীয় রোগ আছে তাদের জন্য চিরতা অনেক উপকারী। আধা গ্রাম চিরতার গুঁড়ো ৩ ঘণ্টা অন্তর মধুসহ চেটে খেলে হাঁপানি দূর হয়। এর জন্য ২ থেকে ৩ দিন এভাবে চিরতা খেতে হবে।

১১। বমি ভাব দূর করে

বদ্ধ গাড়িতে বা ফুড পয়জনিংয়ে আমাদের অনেক সময় বমি হয় বা বমি-বমি ভাব হয়। আর বমি হলে পেটে কিছু থাকে না এবং শরীর অত্যন্ত দূর্বল লাগে। চিরতার রস এই বমি-বমি ভাব দূর করে এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা দিতে পারে।

১২। পঁচা ঘা সারায়

শীতকালে ঘা হলে কিছুতেই শুকাতে চায় না। এক্ষেত্রে আগের দিন রাতে এক কাপ গরম পানিতে ৫ গ্রাম চিরতা ভিজিয়ে রেখে পরদিন সেই জল ছেঁকে পচা ঘা ধুয়ে দিন। এভাবে ২-৪ দিন চিরতা ব্যবহার করলে ঘায়ের পচানি চলে যাবে ও দ্রুত শুকাবে।

১৩। লিভার ভাল রাখে

চিরতা শরীর থেকে ক্ষতিকারক টক্সিন বের করে লিভারকে সুস্থ রাখে। এটি ফ্যাটি লিভারসহ নানা সমস্যা দূর করে। চিরতা রক্ত পরিষ্কারক হিসেবেও ব্যাপক উপকারী। এটি রক্ত পরিষ্কার করে আমাদের শরীরকে টক্সিনমুক্ত রাখে এবং সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে।

১৪। ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে

গবেষণায় পাওয়া গেছে, যারা নিয়মিত চিরতার রস খায়, তাদের দেহে ক্যান্সারের জীবাণু খুব সহজে ঢুকতে পারে না। বিশেষ করে স্তন ক্যান্সার রুখতে চিরতা অনেক উপকারী।

১৫। তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে

শরীরে তারুণ্যতা বজায় থাকার একটি শর্ত হল দেহে পরিমিত মাত্রায় রক্ত সঞ্চালন হওয়া। আর চিরতা রক্ত পরিষ্কার করে দেহে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। যার ফলে দীর্ঘদিন তারুণ্য ধরে রাখা সম্ভব হয়।

সতর্কতা

চিরতা আমাদের শরীরের জন্য অনেক উপকারী- এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এর স্বাদ তেতো হওয়ায় খাওয়ার সময় বমি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই অল্প অল্প করে ধীরে সুস্থে খাওয়া উচিত। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিরতা খাওয়া ভাল। কারণ চিরতা ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে ব্লাড সুগার লেভেল কমিয়ে আনে। অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়া হলে দেহে লো ব্লাড সুগারের প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। চিরতায় তিক্ত স্বাদযুক্ত গ্লুকোসাইড থাকায় গর্ভবতী অবস্থায় চিরতা খাওয়া উচিত নয়। এক্ষেত্রে মা ও সন্তান উভয়ের সমস্যা হতে পারে।
চিরতা একটানা ১৫-৩০ দিন খাওয়া হলে, সমপরিমাণ দিন বিরতি নিয়ে আবার খাওয়া উচিত। এতে চিরতা থেকে আশানুরূপ উপকারীতা পাওয়া যাবে।

পরিশেষে

স্বাদ তেতো হলেও চিরতার রয়েছে নানান গুণ। শুধু তিতা বলে চিরতাকে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ তা’য়ালা বিভিন্ন রোগের উপশমের জন্যই একে তিক্ত করে সৃষ্টি করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত তিতা খান তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে ছোট-বড় নানা রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। তাই চির জীবন সুস্থ থাকতে তিতা হলেও চিরতাই ভাল।

এক্ষেত্রে ভরসা রাখতে পারুন ন্যাচারালস চিরতায়। সেরা মানের চিরতা সংগ্রহ করে স্বাস্থ্যসম্মত এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে ন্যাচারালস চিরতা গুড়া প্রস্তুত করা হয়। এতে কোন প্রকার কৃত্রিম উপাদান, কেমিক্যাল, প্রিজারভেটিভ ও ধুলাবালির মিশ্রণ নেই। ন্যাচারালস চিরতা গুড়া শতভাগ প্রাকৃতিক ও নিরাপদ।

ন্যাচারালসের খাঁটি চিরতা গুড়া কিনুন, নিজের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করুন।

সুস্বাস্থ্য মানেই ন্যাচারালস।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

TOP

0
0 item
My Cart
Empty Cart
X